মেনু নির্বাচন করুন
গল্প নয় সত্যি

কবি আবদুল হাই মাশরেকী

বাংলা কাব্য সাহিত্যে এদেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জীবনের আশা-আকাঙ্খার রূপকার, অসংখ্য কবিতা ও গানের স্রষ্টা আবদুল হাই মাশরেকী তিরিশ দশকের মাটি ও মানুষের কবি। বাংলা সাহিত্যে তিনি প্রথম সকল হত্যা ও সন্ত্রাসের বিরম্নদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে বলেছিলেন, ‘ এই বীভৎস হানাহানি আর-/ এই মৃত্যুকে স্বীকার করিনি কভু,..।  তাই তিনি আমাদের সকল মানুষের ভালোবাসার শ্রদ্ধেয় অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী কবি আবদুল হাই মাশরেকী।

কবি আবদুল হাই মাশরেকী জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৯ সালে ১ এপ্রিল, সার্টিফিকেট অনুযায়ী ১৯১৯ সালে ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জের কাঁকনহাটি গ্রামে তাঁর মামার বাড়িতে। পিতা ছিলেন জমিদার বিরোধী আন্দোলনের তেজোদীপ্ত নায়ক ওসমান গণি সরকার ও মাতা ছিলেন গৃহিনী রহিমা খাতুন। কবি আবদুল হাই মাশরেকী ছোটকাল থেকে গান ও কবিতা রচনা করতেন। কখনো বাড়ির সামনে কাঁচা মাটিয়া নদীর বুকে নিজেই ডিঙ্গি ভাসিয়ে দিয়ে বেড়াতো। পাড়ে উঠতে তাঁর মুখে তখন নতুন গীত আর সুরের গুঞ্জন।  

স্কুলে পড়ার সময় মামার বাড়ি কাঁকনহাটি গ্রামে কিশোর আবদুল হাই লক্ষ্য করেন খরায় ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাঁর মামা (কবির শ্বশুর) উত্তর বন্দে (তখনকার সময় ওই গ্রামের অনেক ফসলী জমি যেখানে ছিল) গ্রামের লোকজন নিয়ে বৃষ্টির জন্য ‘ফরজ নামাজসহ নফল নামাজ ও দুরুদ-জিকির’ আদায় করতেন। যতক্ষণ বৃষ্টি না আসতো সে পর্যন্ত বন্দ থেকে এই ইবাদতকারীরা ঘরে ফিরতেন না। এই প্রকৃতির বৈরী পরিবেশ ও মানুষের বৃষ্টি পাওয়ার আকুতি দেখে ‘আল্লাহ্ মেঘ দে পানি দে ছায়া দেরে তুই আলস্নাহ...’ জনপ্রিয় পলস্নীগীতি কবি আবদুল হাই মাশরেকী রচনা করেন।

আনন্দ মোহন কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ভর্তি হওয়ার পর চাকুরি সন্ধানে আবদুল হাই মাশরেকী চলে যান কলকাতায়। যৌবনের প্রথম দিকে তিনি কলকাতায় এইচএমবি'তে পাঁচ বছরের চুক্তিভিত্তিতে গান রচনা করেন। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময় পূর্ববঙ্গে চলে আসেন। এরপর ঢাকার এইচএমবি'তে গান রচনার জন্য তাঁর সাথে কয়েক বছরের চুক্তি হয়। তবে কর্মজীবনে প্রথমে শিক্ষকতা ও পরে জুট রেগুলেশনে কবি আবদুল হাই মাশরেকী চাকুরি করেন। এরপর দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় সহ-সম্পাদক, দৈনিক বাংলা, পরবর্তীতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘কৃষিকথা’ পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৭৬ সালে অবসরে যান।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে আবদুল হাই মাশরেকী সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন ঢাকা, ময়মনসিংহে। ১৯৬৭-৬৮ সালে ‘ওরে আমার ঝিলাম নদীর পানি’ বিখ্যাত গানের শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের রাষ্ট্রীয় ‘তঘমাই ইমতিয়াজ’ পুরস্কার ঘোষণা করলে আবদুল হাই মাশরেকী তাৎক্ষণিক তা প্রত্যাখান করেন।

১৯৬৭ সালে তৎকালীন সরকারে নির্দেশে কিছুসংখ্যক সাহিত্যিক রবীন্দ্র বিরোধী স্বাক্ষর আবদুল হাই মাশরেকীর কাছে সংগ্রহ করতে গেলে তিনি স্বাক্ষর না দিয়ে ধিক্কার জানিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন।

উপমহাদেশের বিখ্যাত অনুবাদক ননী ভৌমিক আবদুল হাই মাশরেকীর কুলসুম গল্পগ্রন্থটি রুশ ভাষায় রূপান্তর করেন।

উপমহাদেশে তাঁরই লেখা একমাত্র ব্যতিক্রমধর্মী জারী জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনভিত্তিক ‘দুখু মিয়ার জারী।’ লিখেছেন- ‘বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার জারী’, ‘রাখালবন্ধু,’ ‘জরিনা সুন্দরী’ ও ‘কাফনচোরা’র মতো জনপ্রিয় পালাগান। ‘আল্লা মেঘ পানি দে,’ ছায়া দে, ‘ওপারে তোর বসত বাড়ি,’ এসকল বিখ্যাত গানের স্রষ্টা আবদুল হাই মাশরেকী। কিন্তু কবির বিখ্যাত গানগুলো বেনামে কিংবা সংগ্রহ বলে অবহেলিতভাবে চালিয়ে দিচ্ছে মিডিয়গুলো।

আবদুল হাই মাশরেকী শুধু গ্রামীণ বিষয়বস্তু নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করে গণমানুষকে উজ্জীবিত করেননি। তিনি এ যুগের মানুষকে গণতন্ত্রের মন্ত্রে দীক্ষিত করে তুলেছেন তাঁর রচিত গান দিয়ে-‘এসো গণতন্ত্র গড়ে তুলি/ নতুন দিনের/ এসো করব কায়েম রাজ-কলুষ হীনের...।’ ‘চাষার কুটুম শস্য কণা / মন্ত্রী হইছে অনেক জনা / দুখের দিনে তাদের দেখা নাই...।’ শহীদদের স্মরণে ‘এ যে শহীদেও স্মৃতরি মিনার/ ছুঁয়েছে সবার হৃদয় কিনার/ পুণ্যতীর্থ সে অবিনশ্বর। তারা যে অমর...।’ দেশাত্ববোধক গান- ‘বাংলা মা তোর শ্যামল বরণ / হৃদয় আমার করল হরণ।’ আধুনিক গান ‘একদিন হবে ভুলিতে / শুকাবে মালিকা ধূলিতে।’ উল্লেখযোগ্য।

এছাড়াও কবি আবদুল হাই মাশরেকীর কালোত্তীর্ণ কবিতা রয়েছে- এই বীভৎস হানাহানি আর-/ এই মৃত্যুকে স্বীকার করিনি কভু / মানুষের পথ.../ শ্বাপদ হিংস্র নখরে বিঁধেছে তবু/ তবু তো রক্তে ভিজে গেলো রাজপথ......। দেশাত্মবোধক কবিতা ‘হে আমার দেশ’ হৃদয়ের প্রেম দিয়ে তোমাকে তো ভালোবাসি হে দেশ আমার...। স্বাধীনতাউত্তর দেশের দৃশ্যপটের উপরে- ‘এই ত পেয়েছি মাকে/ বাড়ির সামনে তার নতুন কবর/ বধ্যভূমি ঘুরে ঘুরে/ কালোজিরে ধানক্ষেত তীরে এসে দেখি বিধ্বস্ত সকলি.....।’ অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তাঁর সনেট- ‘পশ্চিমের গোর থেকে এইসব অপচ্ছায়া/ আসে চুপি, কথা বলে বাঁধানো কঠিন দাঁতে।/ উটপাখি কবুতর নিরীহ কোকিল কাক/ বেড়াল ছানার মতো কখনো-বা ধরে কায়া/ প্রতি চোখ নির্বিবাদ-সব কথা রাখে আঁতে/ সমবেত কণ্ঠে শুধু শোনায় আজব ডাক।’

কবি আবদুল হাই মাশরেকীর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে- আধুনিক কাব্য ‘কিছু রেখে যেতে চাই’, ‘হে আমার দেশ’, ‘ দেশ দেশ নন্দিতা,’ ‘মাঠের কবিতা মাঠের গান’, ‘কাল নিরবধি’, গীতিনাট্য ও কাব্য ‘ভাটিয়ালী’, পুঁথি কাব্য ‘হযরত আবু বকর (রাঃ),’ খন্ড কাব্য ‘অভিশপ্তের বাণী’, পালাগান ‘রাখালবন্ধু’, ‘জরিনা সুন্দরী’, পল্লীগীতিকা ‘ডাল ধরিয়া নুয়াইয়া কন্যা’, জারি ‘দুখু মিয়ার জারি,’ ছোটদের কাব্য ‘হুতুম ভুতুম রাত্রি’, গল্প ‘কুলসুম’ ‘বাউল মনের নকশা,’ ‘মানুষ ও লাশ’, ‘নদী ভাঙে,’ নাটক ‘সাঁকো’, ‘নতুন গাঁয়ের কাহিনী’, অনুবাদ ‘আকাশ কেন নীল’।

এই মহান কবি আবদুল হাই মাশরেকী ১৯৮৮ সালে ৪ ডিসেম্বর নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন।

এই কবির দুর্লভ বহু পল্লী ও আধুনিক গান, গীতিনাট্য, জারি, কবিতা, গল্প, নাটক ও অনুবাদ তিরিশ দশক থেকে আশি দশকের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। এসব লেখা সংগ্রহ করে দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি ভান্ডারকে আরো সমৃদ্ধ করার দায়িত্ব আমাদের।


Share with :

Facebook Twitter